বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ এক আলোচনা সামনে নিয়ে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু পুথিগত শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে গবেষণা, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা তৈরি এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী দক্ষতা উন্নয়নের দিকে এগোতে হবে। তিনি আরও বলেছেন, বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ শিক্ষক নিয়োগে দলীয় বিবেচনা।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রথম অংশ নিঃসন্দেহে বাস্তবসম্মত। কিন্তু ‘রাজনৈতিক শিক্ষক নিয়োগ’কে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল সংকট হিসেবে চিহ্নিত করার আগে আমাদের আরও গভীরে তাকানো প্রয়োজন। কারণ, বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল ও বহুস্তরীয়।
প্রথমেই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন করা যাক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক পরিচয়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের গবেষণা, প্রকাশনা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও একাডেমিক অবদান বিশ্লেষণ করলে কী দেখা যাবে? অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাবে, তথাকথিত ‘মেধাবী-অরাজনৈতিক’ শিক্ষকদের চেয়ে ‘রাজনৈতিক’ শিক্ষকদের গবেষণা ও প্রশাসনিক পারফরম্যান্স ভালো। অতএব, রাজনীতি করলেই কেউ অযোগ্য- এই ধারণা তথ্যভিত্তিক নয়।
তাহলে সমস্যাটা কোথায়? বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকট, দুর্বল গবেষণা অবকাঠামো, অনুন্নত নিয়োগ কাঠামো এবং নীতিগত অসঙ্গতির মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া বা ইউরোপের বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একজন শিক্ষককে সংসার বাঁচানোর যুদ্ধের মধ্যে থেকে গবেষণা করতে হয় না; সেখানে শক্তিশালী গবেষণা ফান্ড, পোস্টডক সংস্কৃতি, আধুনিক ল্যাব, টেকনিক্যাল সাপোর্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার পরিকল্পনা থাকে।
বাংলাদেশে বাস্তবতা উল্টো। এখানকার অধিকাংশ গবেষক বিদেশ থেকে পিএইচডি বা উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে ফিরে আসতে প্রবল আগ্রহী থাকেন। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই উদ্যম হারিয়ে যায়। কারণ, পিএইচডি শেষ করে আসার পর এ দেশে তাদের জন্য আর কোনো সুযোগ থাকে না। পৃথিবীর কোনো দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে (সেটা যে পর্যায়েই হোক) বয়সসীমা নেই, বাংলাদেশে আছে। এখানে বিভিন্ন সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানেও গবেষক নিয়োগ বয়সের বেড়াজালে আবদ্ধ। অথচ আবদ্ধ হওয়ার কথা ছিল একমাত্র গবেষণা অভিজ্ঞতা ও পিএইচডি। ফলে বিদেশ থেকে ডিগ্রি করে আসার আগেই তারা বুঝতে পারেন, এদেশে তিনি ইতোমধ্যে আবেদনের যোগ্যতা হারিয়েছেন। উপরন্তু, গবেষণা করতে হলে নিজের পকেট থেকেও খরচ করতে হবে, যন্ত্রপাতি নেই, ফান্ড সীমিত, প্রশাসনিক জটিলতা অসীম।
প্রধানমন্ত্রী র্যাংকিং নিয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রেও আমাদের বাস্তববাদী হতে হবে। আমরা যদি কিউএস, টাইমস হায়ার এডুকেশন, সাংহাই র্যাংকিং-এর মূল্যায়ন পদ্ধতির দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই, তারা মূলত যে বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়, সেগুলো হলো- প্রকাশনা, শিক্ষকদের ডিগ্রি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, সাইটেশন, ইনোভেশন, আন্তর্জাতিক কোলাবরেশন, ইন্ডাস্ট্রি সংযোগ এবং গবেষনা ফান্ডিং-ইত্যাদি। অর্থাৎ র্যাংকিং শুধুমাত্র রাজনীতির কারণে কমে না; বরং দুর্বল প্রশাসনিক ও গবেষণা অবকাঠামো, অর্থায়ন ও উদ্ভাবনী সংস্কৃতির অভাবই বড় কারণ।
প্রখ্যাত মার্কিন শিক্ষাবিদ ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্লার্ক খার আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় ধারণা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাভাবনা করেছেন এবং ‘বহুমুখী বিশ্ববিদ্যালয়’ ধারণাটি জনপ্রিয় করেন। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জ্ঞান বিতরণের জায়গা নয়; এটি গবেষণা, উদ্ভাবন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক পরিবর্তনের কেন্দ্র। তিনি বলেছিলেন, ‘Universities are not merely institutions for teaching; they are engines of innovation and social transformation.’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা- বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু পুথিগত শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে গবেষণা, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা তৈরি এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী দক্ষতা উন্নয়নের দিকে এগোতে হবে- এটা মূলত ‘বহুমুখী বিশ্ববিদ্যালয়’ ধারণাটির প্রতিফলন।
অথচ বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠাই হয়েছে টিচিং ইউনিভার্সিটি হিসেবে। অন্যদিকে আজকের বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয় হবে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির কেন্দ্র। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে বিশ্ববিদ্যালয়কে উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক এবং সমস্যা সমাধানকারী মানুষ তৈরি করতে হবে। আর এই বিষয়টি গ্রথিত থাকে কারিকুলামেই। তাই কারিকুলাম সংস্কারের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।
কারিকুলামে শুধু মুখস্থভিত্তিক জ্ঞান নয়, যুক্ত করতে হবে: গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, সামাজিক দায়বদ্ধতা, শিল্প খাতভিত্তিক বাস্তব সমস্যা সমাধান, আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স, জৈব প্রযুক্তি, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবোরেশন এবং সর্বোপরি ইনোভেশন ইকোসিস্টেম। এই জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা মৌলিকভাবে পরিবর্তন করা প্রয়োজন। আর কারিকুলামে তা-ই যুক্ত করতে হবে।
প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস তার ‘বিল্ডিং সোসাল বিজনেস; দ্য নিউ কাইন্ড অব ক্যাপিটালিজম দ্যাট সার্ভস হিউম্যানিটিজ মোস্ট প্রেসিং নিডস’ শিরোনামে বইতে উল্লেখ করেছেন, ‘Young people are not job seekers, they are job creators.’ এই দর্শনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে পুনর্গঠন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু চাকরিপ্রার্থী তৈরি করলে চলবে না; কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী মানুষ তৈরি করতে হবে।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও বাস্তবসম্মত সংস্কার প্রয়োজন। উন্নত দেশেও শিক্ষক নিয়োগে একাডেমিক লবিং, ব্যক্তিগত পছন্দ, আনুগত্য বা নেটওয়ার্কিংয়ের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু সেখানে নিয়োগ একটি শক্তিশালী রুবরিক বেজড ইকোসিস্টেমের মাধ্যমে হয়। একজন শিক্ষক হতে হলে সেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়: পিএইচডি, গবেষণা, প্রকাশনা, পোস্ট-ডক, গ্রান্ট অর্জন, আন্তর্জাতিক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম আরো অনেক কিছুই।
অথচ বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে মাস্টার্স শেষ করেই শিক্ষক হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। সেই সুযোগ ও অর্জনের একমাত্র নিয়ামক হলো একটা ভালো সিজিপিএ; যেটা মূলত: মুখস্ত বিদ্যানির্ভর। ফলে একজন সফল শিক্ষকের নিকট দেশ ও সমাজের প্রত্যাশা পূরণে সেই শিক্ষক সমর্থ না-ও হতে পারেন। ফলশ্রুতিতে, প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে সমগ্র শিক্ষকতা পেশা। এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে যে প্রশ্নটি আসে, তা হলো একজন শিক্ষকের নিকট প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্যমতে জাতির যে প্রত্যাশা, আমাদের দেশে শিক্ষক নিয়োগে সেগুলোর কোনো মূল্যায়ন করা হয় কি না? উত্তর- না, হয় না।
বিশ্বের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন উদাহরণ খুবই বিরল। ফলে শিক্ষক তৈরির কাঠামো ও পাইপলাইন দুর্বল থেকে যায়। অতএব, সমস্যার মূল যদি খুঁজতেই হয়, তাহলে সেটি একমাত্র রাজনীতি নয়; বরং অনুন্নত নিয়োগ কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির অভাব। তাই বিষয়টি আমলে নিয়ে যদি যুগোপযোগী সংস্কার করা যায় তাহলেই প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশা পূরণ হবে। অন্যথায় বাংলাদেশে বহুমুখী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না।
লেখক: ডিন, স্বাস্থ্য বিজ্ঞান অনুষদ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়।
.png)
রোববার, ১৭ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ মে ২০২৬
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ এক আলোচনা সামনে নিয়ে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু পুথিগত শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে গবেষণা, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা তৈরি এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী দক্ষতা উন্নয়নের দিকে এগোতে হবে। তিনি আরও বলেছেন, বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ শিক্ষক নিয়োগে দলীয় বিবেচনা।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রথম অংশ নিঃসন্দেহে বাস্তবসম্মত। কিন্তু ‘রাজনৈতিক শিক্ষক নিয়োগ’কে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল সংকট হিসেবে চিহ্নিত করার আগে আমাদের আরও গভীরে তাকানো প্রয়োজন। কারণ, বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল ও বহুস্তরীয়।
প্রথমেই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন করা যাক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক পরিচয়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের গবেষণা, প্রকাশনা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও একাডেমিক অবদান বিশ্লেষণ করলে কী দেখা যাবে? অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাবে, তথাকথিত ‘মেধাবী-অরাজনৈতিক’ শিক্ষকদের চেয়ে ‘রাজনৈতিক’ শিক্ষকদের গবেষণা ও প্রশাসনিক পারফরম্যান্স ভালো। অতএব, রাজনীতি করলেই কেউ অযোগ্য- এই ধারণা তথ্যভিত্তিক নয়।
তাহলে সমস্যাটা কোথায়? বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকট, দুর্বল গবেষণা অবকাঠামো, অনুন্নত নিয়োগ কাঠামো এবং নীতিগত অসঙ্গতির মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া বা ইউরোপের বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একজন শিক্ষককে সংসার বাঁচানোর যুদ্ধের মধ্যে থেকে গবেষণা করতে হয় না; সেখানে শক্তিশালী গবেষণা ফান্ড, পোস্টডক সংস্কৃতি, আধুনিক ল্যাব, টেকনিক্যাল সাপোর্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার পরিকল্পনা থাকে।
বাংলাদেশে বাস্তবতা উল্টো। এখানকার অধিকাংশ গবেষক বিদেশ থেকে পিএইচডি বা উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে ফিরে আসতে প্রবল আগ্রহী থাকেন। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই উদ্যম হারিয়ে যায়। কারণ, পিএইচডি শেষ করে আসার পর এ দেশে তাদের জন্য আর কোনো সুযোগ থাকে না। পৃথিবীর কোনো দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে (সেটা যে পর্যায়েই হোক) বয়সসীমা নেই, বাংলাদেশে আছে। এখানে বিভিন্ন সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানেও গবেষক নিয়োগ বয়সের বেড়াজালে আবদ্ধ। অথচ আবদ্ধ হওয়ার কথা ছিল একমাত্র গবেষণা অভিজ্ঞতা ও পিএইচডি। ফলে বিদেশ থেকে ডিগ্রি করে আসার আগেই তারা বুঝতে পারেন, এদেশে তিনি ইতোমধ্যে আবেদনের যোগ্যতা হারিয়েছেন। উপরন্তু, গবেষণা করতে হলে নিজের পকেট থেকেও খরচ করতে হবে, যন্ত্রপাতি নেই, ফান্ড সীমিত, প্রশাসনিক জটিলতা অসীম।
প্রধানমন্ত্রী র্যাংকিং নিয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রেও আমাদের বাস্তববাদী হতে হবে। আমরা যদি কিউএস, টাইমস হায়ার এডুকেশন, সাংহাই র্যাংকিং-এর মূল্যায়ন পদ্ধতির দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই, তারা মূলত যে বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়, সেগুলো হলো- প্রকাশনা, শিক্ষকদের ডিগ্রি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, সাইটেশন, ইনোভেশন, আন্তর্জাতিক কোলাবরেশন, ইন্ডাস্ট্রি সংযোগ এবং গবেষনা ফান্ডিং-ইত্যাদি। অর্থাৎ র্যাংকিং শুধুমাত্র রাজনীতির কারণে কমে না; বরং দুর্বল প্রশাসনিক ও গবেষণা অবকাঠামো, অর্থায়ন ও উদ্ভাবনী সংস্কৃতির অভাবই বড় কারণ।
প্রখ্যাত মার্কিন শিক্ষাবিদ ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্লার্ক খার আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় ধারণা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাভাবনা করেছেন এবং ‘বহুমুখী বিশ্ববিদ্যালয়’ ধারণাটি জনপ্রিয় করেন। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জ্ঞান বিতরণের জায়গা নয়; এটি গবেষণা, উদ্ভাবন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক পরিবর্তনের কেন্দ্র। তিনি বলেছিলেন, ‘Universities are not merely institutions for teaching; they are engines of innovation and social transformation.’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা- বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু পুথিগত শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে গবেষণা, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা তৈরি এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী দক্ষতা উন্নয়নের দিকে এগোতে হবে- এটা মূলত ‘বহুমুখী বিশ্ববিদ্যালয়’ ধারণাটির প্রতিফলন।
অথচ বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠাই হয়েছে টিচিং ইউনিভার্সিটি হিসেবে। অন্যদিকে আজকের বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয় হবে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির কেন্দ্র। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে বিশ্ববিদ্যালয়কে উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক এবং সমস্যা সমাধানকারী মানুষ তৈরি করতে হবে। আর এই বিষয়টি গ্রথিত থাকে কারিকুলামেই। তাই কারিকুলাম সংস্কারের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।
কারিকুলামে শুধু মুখস্থভিত্তিক জ্ঞান নয়, যুক্ত করতে হবে: গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, সামাজিক দায়বদ্ধতা, শিল্প খাতভিত্তিক বাস্তব সমস্যা সমাধান, আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স, জৈব প্রযুক্তি, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবোরেশন এবং সর্বোপরি ইনোভেশন ইকোসিস্টেম। এই জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা মৌলিকভাবে পরিবর্তন করা প্রয়োজন। আর কারিকুলামে তা-ই যুক্ত করতে হবে।
প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস তার ‘বিল্ডিং সোসাল বিজনেস; দ্য নিউ কাইন্ড অব ক্যাপিটালিজম দ্যাট সার্ভস হিউম্যানিটিজ মোস্ট প্রেসিং নিডস’ শিরোনামে বইতে উল্লেখ করেছেন, ‘Young people are not job seekers, they are job creators.’ এই দর্শনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে পুনর্গঠন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু চাকরিপ্রার্থী তৈরি করলে চলবে না; কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী মানুষ তৈরি করতে হবে।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও বাস্তবসম্মত সংস্কার প্রয়োজন। উন্নত দেশেও শিক্ষক নিয়োগে একাডেমিক লবিং, ব্যক্তিগত পছন্দ, আনুগত্য বা নেটওয়ার্কিংয়ের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু সেখানে নিয়োগ একটি শক্তিশালী রুবরিক বেজড ইকোসিস্টেমের মাধ্যমে হয়। একজন শিক্ষক হতে হলে সেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়: পিএইচডি, গবেষণা, প্রকাশনা, পোস্ট-ডক, গ্রান্ট অর্জন, আন্তর্জাতিক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম আরো অনেক কিছুই।
অথচ বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে মাস্টার্স শেষ করেই শিক্ষক হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। সেই সুযোগ ও অর্জনের একমাত্র নিয়ামক হলো একটা ভালো সিজিপিএ; যেটা মূলত: মুখস্ত বিদ্যানির্ভর। ফলে একজন সফল শিক্ষকের নিকট দেশ ও সমাজের প্রত্যাশা পূরণে সেই শিক্ষক সমর্থ না-ও হতে পারেন। ফলশ্রুতিতে, প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে সমগ্র শিক্ষকতা পেশা। এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে যে প্রশ্নটি আসে, তা হলো একজন শিক্ষকের নিকট প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্যমতে জাতির যে প্রত্যাশা, আমাদের দেশে শিক্ষক নিয়োগে সেগুলোর কোনো মূল্যায়ন করা হয় কি না? উত্তর- না, হয় না।
বিশ্বের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন উদাহরণ খুবই বিরল। ফলে শিক্ষক তৈরির কাঠামো ও পাইপলাইন দুর্বল থেকে যায়। অতএব, সমস্যার মূল যদি খুঁজতেই হয়, তাহলে সেটি একমাত্র রাজনীতি নয়; বরং অনুন্নত নিয়োগ কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির অভাব। তাই বিষয়টি আমলে নিয়ে যদি যুগোপযোগী সংস্কার করা যায় তাহলেই প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশা পূরণ হবে। অন্যথায় বাংলাদেশে বহুমুখী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না।
লেখক: ডিন, স্বাস্থ্য বিজ্ঞান অনুষদ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়।
.png)
আপনার মতামত লিখুন