দেশে হাম প্রতিরোধী টিকার সংকট, গত এক দশকের মধ্যে হামের সর্বোচ্চ প্রাদুর্ভাব ও রোগটি সংক্রমিত হয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী।
তিনি বলেন, টিকার সংকট এবং হামে শিশুমৃত্যুর ঘটনা তদন্ত শুরু করেছে সরকার। হামে কেন এতগুলো শিশুর মৃত্যু হলো, এ ক্ষেত্রে কারও কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তের ফলাফল সাংবাদিকসহ দেশবাসীকে জানানো হবে।
শনিবার (৯ মে) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডা. মিল্টন হলে বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএইচআরএফ) আয়োজিত ‘হামের প্রাদুর্ভাব ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন তিনি।
তদন্ত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব উল্লেখ করে স্বাস্থ্য সচিব বলেন, প্রত্যেকটি ঘটনার তদন্ত হওয়া দরকার। জনগণের জানা দরকার। আমাদের সরকার একটি গণতান্ত্রিক সরকার, জবাবদিহিমূলক সরকার। আমি বিশ্বাস করি, সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করার জন্য প্রস্তুত।
বৈঠকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, হাম-রুবেলার মতো রোগ প্রতিরোধে টিকার ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন নিয়মিত করা জরুরি। অথচ দেশে ২০১৯ সালের পর আর কোনো ন্যাশনাল ক্যাম্পেইনিং হয়নি। দেশের হাম আক্রান্ত শিশুদের রোগের ধরণ ও অন্যান্য জটিলতা নিরূপণের জন্য ইতোমধ্যে রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটকে (আইইডিসিআর) জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের অনুরোধ করেছি।
তিনি আরও বলেন, হাম ও হামের উপসর্গে মারা যাওয়া শিশুদের ডেথ রিভিউয়ের বিষয়টি আমরা জাতীয় টিকাদান সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপে (নাইট্যাগ) উপস্থাপন করব। তারা পরামর্শ দিলে আমরা শিগগিরই ডেথ রিভিউ শুরু করব। আমার বিশ্বাস প্রত্যেকে তার নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসলে হাম মোকাবেলা দ্রুত সম্ভব হবে।
বৈঠকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে, নতুবা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারত। এত দ্রুত টিকা এনে সেই টিকাদান কর্মসূচি দেশব্যাপী চালু করা- এটি নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল, সরকার সেখানে উত্তীর্ণ হয়েছে। এখন আমাদের উচিত হাম মোকাবেলায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কর্মসূচি সুচারুরূপে চলমান রাখা। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিশ্চয়ই আমরা এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারব।
জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, কোনো মহামারী দেখা দিলে বিষয়টি আমরা স্বীকার করি না। মহামারি ঘোষণা করি না। কিন্তু মহামারী মোকাবেলায় কাজ করি। অথচ পরিস্থিতি স্বীকার করে কাজ করলে উত্তরণ সহজ হয়। হাম পরিস্থিতি মোকাবেলায় একটি ন্যাশনাল গাইডলাইন প্রণয়ন করে সমন্বিতভাবে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ডেন্টাল অনুষদের ডিন ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্থ বলেন, জাতিগতভাবেই আমাদের একটা সমস্যা রয়েছে। আমরা কোনো সমস্যাকে সাধারণ মানুষের কাছে স্বীকার করি না। অন্যের ওপর দায় চাপানোর রাজনীতিও বিদ্যমান রয়েছে। অথচ এসব দায় চাপানোর রাজনীতি বন্ধ করে দেশের সমস্যাকে স্বীকার করে কিভাবে উত্তরণের পথ খোঁজা যায় এ নিয়ে আলোচনা সবচেয়ে বেশি জরুরি।
তিনি আরও বলেন, হামের প্রাদুর্ভাবের পেছনে কিছু অবহেলা আছে এবং কিছু অপরিকল্পিত উদ্যোগ আছে। এর পেছনে দুইটা কারণ তো চিহ্নিত হচ্ছে বারবার- এক হচ্ছে টিকা দেওয়া হয়নি। টিকা আনা হয়নি ঠিকমতো অথবা এসে বসেছিল- যে কারণেই হোক দুটোই সত্য। ঠিক সময় আনাও হয়নি আবার যেটুকু এসেছে সেটা দেওয়া হয়নি।
ডা সায়ন্ত বলেন, ইউনিসেফ প্রধান ডোন্ট ডু দিস ফর গড সেক বলার পরেও কারা এমন করল, কেন ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো বন্ধ থাকল, কেন এই টিকা দেওয়া বন্ধ থাকল, ওই সময় দায়িত্বে কারা ছিলেন, কাদের ভুল সিদ্ধান্তের জন্য এটা হলো, যদি তাদের ব্যাপারেও পদক্ষেপ নেওয়া না হয় এবং তারা যদি দায় না নেন- তাহলে ভবিষ্যতে এই ধারা অব্যাহত থাকবে। যারা দায়ী তাদেরকে প্রয়োজন মত যার যতটুকু ভূমিকা সেটুকুর জন্যই শাস্তির আওতায় আনতে হবে। শাস্তির আগে অন্তত তাদের তরফ থেকে আমরা ভুল স্বীকার করে অ্যাপোলজি প্রত্যাশা করি।
আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, সারা বিশ্বে হামের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো এত মৃত্যুহার বাড়েনি। দেশের চলমান হামের প্রাদুর্ভাব আরও এক থেকে দুই মাস থাকবে। এরপর কমতে শুরু করবে। কিন্তু মুশকিল হলো পরিত্রাণের পর আমরা আবার হাম মোকাবেলার কথা ভুলে যাব। এই কারণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, হাম আক্রান্তের একটি কারণ ম্যাল নিউট্রেশন বা অপুষ্টি। মানুষ যেখানে বেঁচে থাকতে হিমশিম খায় সেখানে কিভাবে তারা পরিবারের পুষ্টি নিশ্চিত করবে? বস্তিবাসীর কেউ সন্তান হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে হামের লক্ষণ নিয়ে, হাসপাতাল থেকে বলা হচ্ছে বাসায় নিয়ে যান, পরিস্থিতির অবনতি হলে নিয়ে আসবেন। তার মানে কী আমরা অবনতির দিকে কাউকে ঠেলে দিচ্ছি?
তিনি আরও বলেন, বস্তিতে কিংবা নিম্ন আয়ের মানুষ যেখানে ঠিকমতো তিনবেলা খেতে পারে না, তারা কিভাবে বাড়িতে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা করে কোয়ারেন্টাইন করবে? এই সমস্যার সমাধানে কমিউনিটি কোয়ারেন্টাইন জরুরি। একই সঙ্গে পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি ঘোষণা করে একটি কর্মকৌশলের আলোকে কাজ করতে হবে।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় পোলিও ও হাম-রুবেলা ল্যাবরেটরির সাবেক প্রধান এবং জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. খন্দকার মাহবুবা জামিল বলেন, হাম-রুবেলা প্রতিরোধে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি করা সবচেয়ে জরুরি। এতে ইমিইউনিটি (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা) বৃদ্ধি পায়। আমাদের মধ্যে আবার হামের পুরোনো ভাইরাস ফিরে এসেছে। এটা দেশীয় ভাইরাস। ভ্যাকসিনেশন গ্যাপ, ইমিউনিটি গ্যাপ আর ব্রেস্ট ফিডিংয়ের অভাবে হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবজাতক বিভাগের অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কুমার দে বলেন, সম্প্রতি বছরে সারা দেশে শিশুদের প্রথম ছয় মাস মায়েল বুকের দুধ খাওয়ার প্রবলতা কমে এসেছে। ছয় মাস শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। নিয়মিত ভ্যাকসিন নিতে হবে। সেইসঙ্গে শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে হাম-রুবেলাসহ অন্যান্য রোগ থেকে শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে।
গোলটেবিল বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএমইউর উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম, ইউনিসেফের হেলথ ম্যানেজার (ইমিউনিজেশন) ডা. রিয়াদ মাহমুদ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর খান, টিকা বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) সাবেক গবেষক ডা. তাজুল ইসলাম এ বারি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ, পুষ্টিবিদ ও ব্র্যাকের ক্লাইমেট ব্রিজ ফান্ডের প্রধান সাইকা সিরাজ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশের ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার (ইমিউনাইজেশন) ডা. চিরঞ্জিত দাস, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল, ইউনিমেড ইউনিহেলথ ফার্মাসিউটিক্যালসের নির্বাহী পরিচালক শামীম আলম খান, ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) প্রতিনিধি অধ্যাপক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান, বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক পরামর্শ ও ফার্মাসিস্ট ড মো. আবু জাফর সাদেক, ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের (এনএইচএ) ডা. হুমায়ুন কবির হিমুসহ অনেকে।
বিএইচআরএফের সভাপতি প্রতীক ইজাজের সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ। হাম পরিস্থিতি কাভারে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিষয়ে তুলে ধরেন বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক তবিবুর রহমান। গোলটেবিল বৈঠক আয়োজনে সার্বিক সহযোগিতা করেছে ইউনিমেড ইউনিহেলথ ফার্মাসিউটিক্যালস।
.png)
রোববার, ১০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ মে ২০২৬
দেশে হাম প্রতিরোধী টিকার সংকট, গত এক দশকের মধ্যে হামের সর্বোচ্চ প্রাদুর্ভাব ও রোগটি সংক্রমিত হয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী।
তিনি বলেন, টিকার সংকট এবং হামে শিশুমৃত্যুর ঘটনা তদন্ত শুরু করেছে সরকার। হামে কেন এতগুলো শিশুর মৃত্যু হলো, এ ক্ষেত্রে কারও কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তের ফলাফল সাংবাদিকসহ দেশবাসীকে জানানো হবে।
শনিবার (৯ মে) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডা. মিল্টন হলে বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএইচআরএফ) আয়োজিত ‘হামের প্রাদুর্ভাব ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন তিনি।
তদন্ত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব উল্লেখ করে স্বাস্থ্য সচিব বলেন, প্রত্যেকটি ঘটনার তদন্ত হওয়া দরকার। জনগণের জানা দরকার। আমাদের সরকার একটি গণতান্ত্রিক সরকার, জবাবদিহিমূলক সরকার। আমি বিশ্বাস করি, সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করার জন্য প্রস্তুত।
বৈঠকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, হাম-রুবেলার মতো রোগ প্রতিরোধে টিকার ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন নিয়মিত করা জরুরি। অথচ দেশে ২০১৯ সালের পর আর কোনো ন্যাশনাল ক্যাম্পেইনিং হয়নি। দেশের হাম আক্রান্ত শিশুদের রোগের ধরণ ও অন্যান্য জটিলতা নিরূপণের জন্য ইতোমধ্যে রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটকে (আইইডিসিআর) জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের অনুরোধ করেছি।
তিনি আরও বলেন, হাম ও হামের উপসর্গে মারা যাওয়া শিশুদের ডেথ রিভিউয়ের বিষয়টি আমরা জাতীয় টিকাদান সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপে (নাইট্যাগ) উপস্থাপন করব। তারা পরামর্শ দিলে আমরা শিগগিরই ডেথ রিভিউ শুরু করব। আমার বিশ্বাস প্রত্যেকে তার নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসলে হাম মোকাবেলা দ্রুত সম্ভব হবে।
বৈঠকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে, নতুবা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারত। এত দ্রুত টিকা এনে সেই টিকাদান কর্মসূচি দেশব্যাপী চালু করা- এটি নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল, সরকার সেখানে উত্তীর্ণ হয়েছে। এখন আমাদের উচিত হাম মোকাবেলায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কর্মসূচি সুচারুরূপে চলমান রাখা। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিশ্চয়ই আমরা এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারব।
জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, কোনো মহামারী দেখা দিলে বিষয়টি আমরা স্বীকার করি না। মহামারি ঘোষণা করি না। কিন্তু মহামারী মোকাবেলায় কাজ করি। অথচ পরিস্থিতি স্বীকার করে কাজ করলে উত্তরণ সহজ হয়। হাম পরিস্থিতি মোকাবেলায় একটি ন্যাশনাল গাইডলাইন প্রণয়ন করে সমন্বিতভাবে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ডেন্টাল অনুষদের ডিন ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্থ বলেন, জাতিগতভাবেই আমাদের একটা সমস্যা রয়েছে। আমরা কোনো সমস্যাকে সাধারণ মানুষের কাছে স্বীকার করি না। অন্যের ওপর দায় চাপানোর রাজনীতিও বিদ্যমান রয়েছে। অথচ এসব দায় চাপানোর রাজনীতি বন্ধ করে দেশের সমস্যাকে স্বীকার করে কিভাবে উত্তরণের পথ খোঁজা যায় এ নিয়ে আলোচনা সবচেয়ে বেশি জরুরি।
তিনি আরও বলেন, হামের প্রাদুর্ভাবের পেছনে কিছু অবহেলা আছে এবং কিছু অপরিকল্পিত উদ্যোগ আছে। এর পেছনে দুইটা কারণ তো চিহ্নিত হচ্ছে বারবার- এক হচ্ছে টিকা দেওয়া হয়নি। টিকা আনা হয়নি ঠিকমতো অথবা এসে বসেছিল- যে কারণেই হোক দুটোই সত্য। ঠিক সময় আনাও হয়নি আবার যেটুকু এসেছে সেটা দেওয়া হয়নি।
ডা সায়ন্ত বলেন, ইউনিসেফ প্রধান ডোন্ট ডু দিস ফর গড সেক বলার পরেও কারা এমন করল, কেন ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো বন্ধ থাকল, কেন এই টিকা দেওয়া বন্ধ থাকল, ওই সময় দায়িত্বে কারা ছিলেন, কাদের ভুল সিদ্ধান্তের জন্য এটা হলো, যদি তাদের ব্যাপারেও পদক্ষেপ নেওয়া না হয় এবং তারা যদি দায় না নেন- তাহলে ভবিষ্যতে এই ধারা অব্যাহত থাকবে। যারা দায়ী তাদেরকে প্রয়োজন মত যার যতটুকু ভূমিকা সেটুকুর জন্যই শাস্তির আওতায় আনতে হবে। শাস্তির আগে অন্তত তাদের তরফ থেকে আমরা ভুল স্বীকার করে অ্যাপোলজি প্রত্যাশা করি।
আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, সারা বিশ্বে হামের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো এত মৃত্যুহার বাড়েনি। দেশের চলমান হামের প্রাদুর্ভাব আরও এক থেকে দুই মাস থাকবে। এরপর কমতে শুরু করবে। কিন্তু মুশকিল হলো পরিত্রাণের পর আমরা আবার হাম মোকাবেলার কথা ভুলে যাব। এই কারণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, হাম আক্রান্তের একটি কারণ ম্যাল নিউট্রেশন বা অপুষ্টি। মানুষ যেখানে বেঁচে থাকতে হিমশিম খায় সেখানে কিভাবে তারা পরিবারের পুষ্টি নিশ্চিত করবে? বস্তিবাসীর কেউ সন্তান হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে হামের লক্ষণ নিয়ে, হাসপাতাল থেকে বলা হচ্ছে বাসায় নিয়ে যান, পরিস্থিতির অবনতি হলে নিয়ে আসবেন। তার মানে কী আমরা অবনতির দিকে কাউকে ঠেলে দিচ্ছি?
তিনি আরও বলেন, বস্তিতে কিংবা নিম্ন আয়ের মানুষ যেখানে ঠিকমতো তিনবেলা খেতে পারে না, তারা কিভাবে বাড়িতে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা করে কোয়ারেন্টাইন করবে? এই সমস্যার সমাধানে কমিউনিটি কোয়ারেন্টাইন জরুরি। একই সঙ্গে পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি ঘোষণা করে একটি কর্মকৌশলের আলোকে কাজ করতে হবে।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় পোলিও ও হাম-রুবেলা ল্যাবরেটরির সাবেক প্রধান এবং জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. খন্দকার মাহবুবা জামিল বলেন, হাম-রুবেলা প্রতিরোধে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি করা সবচেয়ে জরুরি। এতে ইমিইউনিটি (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা) বৃদ্ধি পায়। আমাদের মধ্যে আবার হামের পুরোনো ভাইরাস ফিরে এসেছে। এটা দেশীয় ভাইরাস। ভ্যাকসিনেশন গ্যাপ, ইমিউনিটি গ্যাপ আর ব্রেস্ট ফিডিংয়ের অভাবে হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবজাতক বিভাগের অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কুমার দে বলেন, সম্প্রতি বছরে সারা দেশে শিশুদের প্রথম ছয় মাস মায়েল বুকের দুধ খাওয়ার প্রবলতা কমে এসেছে। ছয় মাস শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। নিয়মিত ভ্যাকসিন নিতে হবে। সেইসঙ্গে শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে হাম-রুবেলাসহ অন্যান্য রোগ থেকে শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে।
গোলটেবিল বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএমইউর উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম, ইউনিসেফের হেলথ ম্যানেজার (ইমিউনিজেশন) ডা. রিয়াদ মাহমুদ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর খান, টিকা বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) সাবেক গবেষক ডা. তাজুল ইসলাম এ বারি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ, পুষ্টিবিদ ও ব্র্যাকের ক্লাইমেট ব্রিজ ফান্ডের প্রধান সাইকা সিরাজ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশের ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার (ইমিউনাইজেশন) ডা. চিরঞ্জিত দাস, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল, ইউনিমেড ইউনিহেলথ ফার্মাসিউটিক্যালসের নির্বাহী পরিচালক শামীম আলম খান, ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) প্রতিনিধি অধ্যাপক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান, বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক পরামর্শ ও ফার্মাসিস্ট ড মো. আবু জাফর সাদেক, ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের (এনএইচএ) ডা. হুমায়ুন কবির হিমুসহ অনেকে।
বিএইচআরএফের সভাপতি প্রতীক ইজাজের সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ। হাম পরিস্থিতি কাভারে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিষয়ে তুলে ধরেন বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক তবিবুর রহমান। গোলটেবিল বৈঠক আয়োজনে সার্বিক সহযোগিতা করেছে ইউনিমেড ইউনিহেলথ ফার্মাসিউটিক্যালস।
.png)
আপনার মতামত লিখুন