সার্চ টুডে

দেশ জুড়ে ঈদের আনন্দ, স্টেশন জুড়ে পথশিশুদের কান্না



দেশ জুড়ে ঈদের আনন্দ, স্টেশন জুড়ে পথশিশুদের কান্না
দেশ জুড়ে ঈদের আনন্দ, স্টেশন জুড়ে পথশিশুদের কান্না

যখন সারা দেশ কোরবানির ঈদের আনন্দে মেতে ওঠে, ঘরে ঘরে রান্না হয় কোরবানির মাংস, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে কাটে আনন্দঘন সময়, তখন রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, বিমানবন্দর রেলস্টেশন এবং দেশের বিভিন্ন পরিবহন কেন্দ্রে থাকা হাজারো পথশিশুর জীবনে ঈদ আসে এক ভিন্ন বাস্তবতা নিয়ে।

ঈদের তৃতীয় দিনে রাজধানীর বিভিন্ন স্টেশন ও লঞ্চঘাট ঘুরে দেখা যায় হৃদয় বিদারক এক চিত্র। যেখানে নেই নতুন পোশাকের আনন্দ, নেই কোরবানির মাংস খাওয়ার উচ্ছ্বাস, নেই পরিবারের সান্নিধ্য। বরং ক্ষুধা, অনিশ্চয়তা ও নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবই যেন তাদের ঈদের প্রধান সঙ্গী।

কমলাপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মের এক কোণে বসে থাকা ১২ বছর বয়সী রাসেল জানায়, মানুষ বলে ঈদ আনন্দের দিন। কিন্তু আমাদের জন্য সব দিনই একই রকম। বরং ঈদে কষ্ট আরও বেড়ে যায়। স্টেশনে থাকতে দেয় না, ঘুমাতে দেয় না। খাবারও পাওয়া যায় না।

একই কথা জানায় সদরঘাটের ১০ বছর বয়সী রুবেল। সে বলে, ঈদের সময় সবাই বাড়ি যায়। আমাদের তো বাড়ি নেই। দুই দিন ধরে ঠিক মতো কিছু খাইনি। রাতে কোথায় ঘুমাবো সেটাও জানি না।

ঈদ এলে কেন বাড়ে কষ্ট?

পথশিশুদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঈদের সময় যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্টেশন, লঞ্চঘাট ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। ফলে অনেক পথশিশুকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। যেসব জায়গা তাদের আশ্রয়স্থল ছিল, সেগুলোও তাদের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায়।

অন্যদিকে, সারা বছর যেসব বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও শিশুদের খাবার, শিক্ষা ও মৌলিক সহায়তা দিয়ে থাকে, ঈদের ছুটিতে তাদের অনেক কার্যক্রমও সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে। ফলে শিশুদের খাদ্যসংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

শিশুরা অভিযোগ করে, অনেক সময় কোনো অপরাধ না করেও তাদের সন্দেহ ভাজন হিসেবে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় বা বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়।

বাংলাদেশে কত পথশিশু?

সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে কয়েক লাখ পথশিশু রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় এই সংখ্যা ৬ থেকে ১০ লাখেরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকাতেই বসবাস করে কয়েক লাখ সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশু।

এদের একটি বড় অংশ রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট, ফুটপাত ও বস্তি এলাকায় বসবাস করে। অধিকাংশ শিশু শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ আশ্রয় এবং পারিবারিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত।

রাষ্ট্রের দায় কোথায়?

বাংলাদেশের সংবিধান শিশুদের নিরাপত্তা, শিক্ষা ও উন্নয়নের অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেছে। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদেও প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ জীবন, খাদ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো ঈদের দিনে যখন দেশের কোটি মানুষ আনন্দ ভাগাভাগি করে, তখন কেন হাজারো পথশিশু না খেয়ে রাত কাটায়?

কেন তাদের জন্য নেই পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র?

কেন ঈদের মতো বিশেষ দিনগুলোতে তাদের জন্য থাকে না রাষ্ট্রের বিশেষ উদ্যোগ?

কেন এখনো হাজারো শিশু স্টেশন, ফুটপাত আর লঞ্চঘাটকে নিজের ঘর হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়?

একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রে কোনো শিশুর শৈশব রেললাইনের পাশে, ফুটপাতে বা ক্ষুধার সঙ্গে যুদ্ধ করে কাটার কথা নয়।

ঈদের মূল শিক্ষা হলো ত্যাগ, সহমর্মিতা ও মানবতা। কিন্তু সমাজের সবচেয়ে অসহায় এই শিশুদের জীবন কি সেই মানবিকতার ছোঁয়া পাচ্ছে?

যে শিশুটি কোরবানির মাংসের গন্ধ পেয়ে সারাদিন ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু এক টুকরো মাংসও খেতে পারে না তার কাছে ঈদ কেমন?

যে শিশুটি রাতে ঘুমানোর জায়গা হারিয়ে স্টেশনের এক কোণ থেকে আরেক কোণে ছুটে বেড়ায় তার কাছে উৎসবের অর্থ কী?

কবে শেষ হবে শিশুদের এই অপেক্ষা?

দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, উন্নয়নের নতুন গল্প লেখা হচ্ছে। কিন্তু সেই গল্পের বাইরে রয়ে গেছে হাজারো পথশিশু।

তাদেরও স্বপ্ন আছে। তারাও নতুন জামা পরতে চায়, পরিবার নিয়ে ঈদ করতে চায়, নিরাপদ ঘরে ঘুমাতে চায়। তারা করুণা নয়, অধিকার চায়।

রাষ্ট্র, সমাজ এবং সচেতন নাগরিকদের প্রতি আজ প্রশ্ন রেখে যায় এই শিশুরা

**কবে শেষ হবে পথশিশুদের এই অনিশ্চিত জীবন?

**কবে ঈদের আনন্দ তাদের কাছেও সমানভাবে পৌঁছাবে?

**কবে একটি শিশুকেও আর স্টেশন বা ফুটপাতে রাত কাটাতে হবে না?

সেই উত্তর খুঁজছে বাংলাদেশের হাজারো পথশিশু প্রতিটি ঈদে, প্রতিটি রাতে, প্রতিটি ক্ষুধার্ত অপেক্ষায়।

আপনার মতামত লিখুন

সার্চ টুডে

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬


দেশ জুড়ে ঈদের আনন্দ, স্টেশন জুড়ে পথশিশুদের কান্না

প্রকাশের তারিখ : ৩০ মে ২০২৬

featured Image



যখন সারা দেশ কোরবানির ঈদের আনন্দে মেতে ওঠে, ঘরে ঘরে রান্না হয় কোরবানির মাংস, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে কাটে আনন্দঘন সময়, তখন রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, বিমানবন্দর রেলস্টেশন এবং দেশের বিভিন্ন পরিবহন কেন্দ্রে থাকা হাজারো পথশিশুর জীবনে ঈদ আসে এক ভিন্ন বাস্তবতা নিয়ে।


ঈদের তৃতীয় দিনে রাজধানীর বিভিন্ন স্টেশন ও লঞ্চঘাট ঘুরে দেখা যায় হৃদয় বিদারক এক চিত্র। যেখানে নেই নতুন পোশাকের আনন্দ, নেই কোরবানির মাংস খাওয়ার উচ্ছ্বাস, নেই পরিবারের সান্নিধ্য। বরং ক্ষুধা, অনিশ্চয়তা ও নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবই যেন তাদের ঈদের প্রধান সঙ্গী।


কমলাপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মের এক কোণে বসে থাকা ১২ বছর বয়সী রাসেল জানায়, মানুষ বলে ঈদ আনন্দের দিন। কিন্তু আমাদের জন্য সব দিনই একই রকম। বরং ঈদে কষ্ট আরও বেড়ে যায়। স্টেশনে থাকতে দেয় না, ঘুমাতে দেয় না। খাবারও পাওয়া যায় না।


একই কথা জানায় সদরঘাটের ১০ বছর বয়সী রুবেল। সে বলে, ঈদের সময় সবাই বাড়ি যায়। আমাদের তো বাড়ি নেই। দুই দিন ধরে ঠিক মতো কিছু খাইনি। রাতে কোথায় ঘুমাবো সেটাও জানি না।


ঈদ এলে কেন বাড়ে কষ্ট?


পথশিশুদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঈদের সময় যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্টেশন, লঞ্চঘাট ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। ফলে অনেক পথশিশুকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। যেসব জায়গা তাদের আশ্রয়স্থল ছিল, সেগুলোও তাদের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায়।


অন্যদিকে, সারা বছর যেসব বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও শিশুদের খাবার, শিক্ষা ও মৌলিক সহায়তা দিয়ে থাকে, ঈদের ছুটিতে তাদের অনেক কার্যক্রমও সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে। ফলে শিশুদের খাদ্যসংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে।


শিশুরা অভিযোগ করে, অনেক সময় কোনো অপরাধ না করেও তাদের সন্দেহ ভাজন হিসেবে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় বা বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়।


বাংলাদেশে কত পথশিশু?


সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে কয়েক লাখ পথশিশু রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় এই সংখ্যা ৬ থেকে ১০ লাখেরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকাতেই বসবাস করে কয়েক লাখ সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশু।


এদের একটি বড় অংশ রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট, ফুটপাত ও বস্তি এলাকায় বসবাস করে। অধিকাংশ শিশু শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ আশ্রয় এবং পারিবারিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত।


রাষ্ট্রের দায় কোথায়?


বাংলাদেশের সংবিধান শিশুদের নিরাপত্তা, শিক্ষা ও উন্নয়নের অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেছে। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদেও প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ জীবন, খাদ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।


কিন্তু প্রশ্ন হলো ঈদের দিনে যখন দেশের কোটি মানুষ আনন্দ ভাগাভাগি করে, তখন কেন হাজারো পথশিশু না খেয়ে রাত কাটায়?


কেন তাদের জন্য নেই পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র?


কেন ঈদের মতো বিশেষ দিনগুলোতে তাদের জন্য থাকে না রাষ্ট্রের বিশেষ উদ্যোগ?


কেন এখনো হাজারো শিশু স্টেশন, ফুটপাত আর লঞ্চঘাটকে নিজের ঘর হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়?


একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রে কোনো শিশুর শৈশব রেললাইনের পাশে, ফুটপাতে বা ক্ষুধার সঙ্গে যুদ্ধ করে কাটার কথা নয়।



ঈদের মূল শিক্ষা হলো ত্যাগ, সহমর্মিতা ও মানবতা। কিন্তু সমাজের সবচেয়ে অসহায় এই শিশুদের জীবন কি সেই মানবিকতার ছোঁয়া পাচ্ছে?


যে শিশুটি কোরবানির মাংসের গন্ধ পেয়ে সারাদিন ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু এক টুকরো মাংসও খেতে পারে না তার কাছে ঈদ কেমন?


যে শিশুটি রাতে ঘুমানোর জায়গা হারিয়ে স্টেশনের এক কোণ থেকে আরেক কোণে ছুটে বেড়ায় তার কাছে উৎসবের অর্থ কী?


কবে শেষ হবে শিশুদের এই অপেক্ষা?


দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, উন্নয়নের নতুন গল্প লেখা হচ্ছে। কিন্তু সেই গল্পের বাইরে রয়ে গেছে হাজারো পথশিশু।


তাদেরও স্বপ্ন আছে। তারাও নতুন জামা পরতে চায়, পরিবার নিয়ে ঈদ করতে চায়, নিরাপদ ঘরে ঘুমাতে চায়। তারা করুণা নয়, অধিকার চায়।


রাষ্ট্র, সমাজ এবং সচেতন নাগরিকদের প্রতি আজ প্রশ্ন রেখে যায় এই শিশুরা


**কবে শেষ হবে পথশিশুদের এই অনিশ্চিত জীবন?


**কবে ঈদের আনন্দ তাদের কাছেও সমানভাবে পৌঁছাবে?


**কবে একটি শিশুকেও আর স্টেশন বা ফুটপাতে রাত কাটাতে হবে না?


সেই উত্তর খুঁজছে বাংলাদেশের হাজারো পথশিশু প্রতিটি ঈদে, প্রতিটি রাতে, প্রতিটি ক্ষুধার্ত অপেক্ষায়।



সার্চ টুডে

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজাম্মুল হোসেন
বার্তা সম্পাদক: মোঃ হুমায়ূন কবীর
লিগ্যাল এডভাইজার: সৌরভ গাঙ্গুলি
উপদেষ্টা: সাজ্জাদ আলম খান সজল

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত সার্চটুডে