সার্চ টুডে

জান্নাতি ঝরনা জমজমের সূচনা



জান্নাতি ঝরনা জমজমের সূচনা
ছবি : সংগৃহীত

মরুভূমির তপ্ত বালুকারাশির মধ্যে এক অলৌকিক ঝরনাধারা ‘জমজম’। এটি শুধু একটি কূপ নয়, বরং মহান আল্লাহর কুদরতের এক জীবন্ত নিদর্শন। হাজার হাজার বছর ধরে কোটি কোটি তৃষ্ণার্ত মানুষের পিপাসা মিটিয়ে আসা এই কূপের পানি পবিত্রতা, বরকত এবং আরোগ্যের প্রতীক। বিশেষ করে, পবিত্র হজের মৌসুমে জমজম কূপের গুরুত্ব ও তাৎপর্য মুমিন হৃদয়ে এক অনন্য আবেগ তৈরি করে।

খ্রিষ্টপূর্ব ২১০০ থেকে ১৯০০ অব্দের মাঝামাঝি। ইতিহাসের বিভাজন অনুযায়ী সময়টি ব্রোঞ্জ যুগ। তবে ধর্মীয় ও সভ্যতার প্রেক্ষাপটে এটি ছিল ‘পিতা-পিতামহদের যুগ’ (Age of the Patriarchs)। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৭৭ মিটার উঁচুতে চারদিকে পাহাড়ে ঘেরা মাঝখানে জনমানবহীন ঢালু উত্তপ্ত মরুভূমি থেকে চিন্তিত মুখে ফিরে যাচ্ছেন ইব্রাহিম (আ.)। তিনি চলে যাওয়ার সময় তার স্ত্রী হাজেরা (আ.) ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আপনি কি আমাদের এভাবে ফেলে যাচ্ছেন?’ ইব্রাহিম (আ.) কোনো উত্তর দেননি। কিন্তু যখন হাজেরা (আ.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘আল্লাহ কি আপনাকে এই আদেশ দিয়েছেন?’ তখন ইব্রাহিম (আ.) বললেন, ‘হ্যাঁ।’ জবাবে হাজেরা (আ.) দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘তাহলে আল্লাহ আমাদের ধ্বংস করবেন না।’

 অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের সঙ্গে থাকা সামান্য খাবার ও পানি শেষ হয়ে যায়। প্রখর রোদে তৃষ্ণায় শিশু ইসমাইল (আ.) ছটফট করতে থাকেন। সন্তানের এই কষ্ট মা হাজেরা সহ্য করতে পারছিলেন না। উত্তপ্ত মরুভূমিতে পার্শ্ববর্তী পাহাড়গুলোর মধ্যে মরীচিকার সৃষ্টি হয়। সেখানে পানির উৎস আছে মনে করে সেদিকে ছুটতে থাকেন তিনি। এভাবে সাফা থেকে মারওয়া এবং মারওয়া থেকে সাফা সাতবার আসা-যাওয়া করেন। দুই পাহাড়ের মাঝখানে একটি নিচু জায়গা ছিল, যেখান থেকে শিশু ইসমাইলকে দেখা যেত না। সেই অংশটুকু তিনি দ্রুত দৌড়ে পার হতেন, যা বর্তমানে পবিত্র হজ ও ওমরাহর সময় পুরুষদের জন্য এই স্থানে সবুজ বাতি দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সেখানে দৌড়ানো সুন্নত।


সপ্তমবার যখন তিনি মারওয়া পাহাড়ে পৌঁছান, তখন একটি শব্দ শুনতে পান। তিনি সেখানে জিবরাইল (আ.)-কে দেখতে পান। জিবরাইল (আ.) তার ডানা বা পায়ের গোড়ালি দিয়ে মাটিতে আঘাত করলেন। সঙ্গে সঙ্গে পাথুরে শক্ত মাটি থেকে স্বচ্ছ পানির ধারা বেরিয়ে আসতে শুরু করে। বিবি হাজেরা অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে পানির চারপাশে বালু দিয়ে বাঁধ দিতে থাকেন এবং বলছিলেন ‘জমজম’ (থামো ও থামো)।

পবিত্র হজের মূল আনুষ্ঠানিকতাগুলোর সঙ্গে জমজমের পানি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। হজের প্রতিটি ধাপে যখন হাজিরা ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তখন জমজম তাদের ক্লান্তি দূর করে আত্মিক প্রশান্তি দান করে। হাজেরা (আ.)-এর সেই স্মৃতি স্মরণে হাজিরা যখন সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে দৌড়ান, তখন তাদের পিপাসা মেটানোর প্রধান উৎস হয় জমজম। কাবার চারদিকে তাওয়াফ সম্পন্ন করার পর দুই রাকাত নামাজ শেষে জমজমের পানি পান করেন হাজিরা।

জমজমের পানি পান করার দোয়া ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা ইলমান নাফিআঁও, ওয়া রিজকান ওয়াসিআঁও, ওয়া শিফা-আম মিন কুল্লি দা-ইন।’ অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, প্রশস্ত রিজিক এবং সমস্ত রোগ থেকে আরোগ্য কামনা করছি।’ জমজমের পানির মাহাত্ম্য সম্পর্কে মহানবী (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘জমজমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হবে, তা-ই পূরণ হবে।’ (ইবনে মাজাহ)

আল্লাহর এক বিস্ময়কর সৃষ্টি জমজম কূপ। হাজার বছর ধরে অবিরত জান্নাতি পানির প্রবাহ কোটি কোটি মানুষের পেট ও আত্মাকে ভরিয়ে দিচ্ছে। হজের প্রতিটি মুহূর্তে জমজমের পানি হাজিদের হৃদয়ে ঈমানি শক্তি জোগায় এবং মহান আল্লাহর অলৌকিক সৃষ্টিকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

আপনার মতামত লিখুন

সার্চ টুডে

শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬


জান্নাতি ঝরনা জমজমের সূচনা

প্রকাশের তারিখ : ১৫ মে ২০২৬

featured Image

মরুভূমির তপ্ত বালুকারাশির মধ্যে এক অলৌকিক ঝরনাধারা ‘জমজম’। এটি শুধু একটি কূপ নয়, বরং মহান আল্লাহর কুদরতের এক জীবন্ত নিদর্শন। হাজার হাজার বছর ধরে কোটি কোটি তৃষ্ণার্ত মানুষের পিপাসা মিটিয়ে আসা এই কূপের পানি পবিত্রতা, বরকত এবং আরোগ্যের প্রতীক। বিশেষ করে, পবিত্র হজের মৌসুমে জমজম কূপের গুরুত্ব ও তাৎপর্য মুমিন হৃদয়ে এক অনন্য আবেগ তৈরি করে।


খ্রিষ্টপূর্ব ২১০০ থেকে ১৯০০ অব্দের মাঝামাঝি। ইতিহাসের বিভাজন অনুযায়ী সময়টি ব্রোঞ্জ যুগ। তবে ধর্মীয় ও সভ্যতার প্রেক্ষাপটে এটি ছিল ‘পিতা-পিতামহদের যুগ’ (Age of the Patriarchs)। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৭৭ মিটার উঁচুতে চারদিকে পাহাড়ে ঘেরা মাঝখানে জনমানবহীন ঢালু উত্তপ্ত মরুভূমি থেকে চিন্তিত মুখে ফিরে যাচ্ছেন ইব্রাহিম (আ.)। তিনি চলে যাওয়ার সময় তার স্ত্রী হাজেরা (আ.) ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আপনি কি আমাদের এভাবে ফেলে যাচ্ছেন?’ ইব্রাহিম (আ.) কোনো উত্তর দেননি। কিন্তু যখন হাজেরা (আ.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘আল্লাহ কি আপনাকে এই আদেশ দিয়েছেন?’ তখন ইব্রাহিম (আ.) বললেন, ‘হ্যাঁ।’ জবাবে হাজেরা (আ.) দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘তাহলে আল্লাহ আমাদের ধ্বংস করবেন না।’

 অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের সঙ্গে থাকা সামান্য খাবার ও পানি শেষ হয়ে যায়। প্রখর রোদে তৃষ্ণায় শিশু ইসমাইল (আ.) ছটফট করতে থাকেন। সন্তানের এই কষ্ট মা হাজেরা সহ্য করতে পারছিলেন না। উত্তপ্ত মরুভূমিতে পার্শ্ববর্তী পাহাড়গুলোর মধ্যে মরীচিকার সৃষ্টি হয়। সেখানে পানির উৎস আছে মনে করে সেদিকে ছুটতে থাকেন তিনি। এভাবে সাফা থেকে মারওয়া এবং মারওয়া থেকে সাফা সাতবার আসা-যাওয়া করেন। দুই পাহাড়ের মাঝখানে একটি নিচু জায়গা ছিল, যেখান থেকে শিশু ইসমাইলকে দেখা যেত না। সেই অংশটুকু তিনি দ্রুত দৌড়ে পার হতেন, যা বর্তমানে পবিত্র হজ ও ওমরাহর সময় পুরুষদের জন্য এই স্থানে সবুজ বাতি দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সেখানে দৌড়ানো সুন্নত।



সপ্তমবার যখন তিনি মারওয়া পাহাড়ে পৌঁছান, তখন একটি শব্দ শুনতে পান। তিনি সেখানে জিবরাইল (আ.)-কে দেখতে পান। জিবরাইল (আ.) তার ডানা বা পায়ের গোড়ালি দিয়ে মাটিতে আঘাত করলেন। সঙ্গে সঙ্গে পাথুরে শক্ত মাটি থেকে স্বচ্ছ পানির ধারা বেরিয়ে আসতে শুরু করে। বিবি হাজেরা অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে পানির চারপাশে বালু দিয়ে বাঁধ দিতে থাকেন এবং বলছিলেন ‘জমজম’ (থামো ও থামো)।


পবিত্র হজের মূল আনুষ্ঠানিকতাগুলোর সঙ্গে জমজমের পানি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। হজের প্রতিটি ধাপে যখন হাজিরা ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তখন জমজম তাদের ক্লান্তি দূর করে আত্মিক প্রশান্তি দান করে। হাজেরা (আ.)-এর সেই স্মৃতি স্মরণে হাজিরা যখন সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে দৌড়ান, তখন তাদের পিপাসা মেটানোর প্রধান উৎস হয় জমজম। কাবার চারদিকে তাওয়াফ সম্পন্ন করার পর দুই রাকাত নামাজ শেষে জমজমের পানি পান করেন হাজিরা।


জমজমের পানি পান করার দোয়া ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা ইলমান নাফিআঁও, ওয়া রিজকান ওয়াসিআঁও, ওয়া শিফা-আম মিন কুল্লি দা-ইন।’ অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, প্রশস্ত রিজিক এবং সমস্ত রোগ থেকে আরোগ্য কামনা করছি।’ জমজমের পানির মাহাত্ম্য সম্পর্কে মহানবী (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘জমজমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হবে, তা-ই পূরণ হবে।’ (ইবনে মাজাহ)


আল্লাহর এক বিস্ময়কর সৃষ্টি জমজম কূপ। হাজার বছর ধরে অবিরত জান্নাতি পানির প্রবাহ কোটি কোটি মানুষের পেট ও আত্মাকে ভরিয়ে দিচ্ছে। হজের প্রতিটি মুহূর্তে জমজমের পানি হাজিদের হৃদয়ে ঈমানি শক্তি জোগায় এবং মহান আল্লাহর অলৌকিক সৃষ্টিকে স্মরণ করিয়ে দেয়।


সার্চ টুডে

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজাম্মুল হোসেন
বার্তা সম্পাদক: মোঃ হুমায়ূন কবীর
লিগ্যাল এডভাইজার: সৌরভ গাঙ্গুলি
উপদেষ্টা: সাজ্জাদ আলম খান সজল

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত সার্চটুডে