জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সারা দেশে শত শত মানুষের মৃত্যুর ঘটনাকে পুঁজি করে ব্যক্তিগত অপরাধকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা বেরিয়ে এসেছে গাজীপুরে।
পরকীয়ার জেরে আবু সাঈদ নামের এক যুবক খুন হওয়ার পর সেটিকে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড দাবি করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৬৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন নিহত যুবকের বাবা। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে ধরা পড়েছে এই জালিয়াতি।
২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর শ্রীপুর থানায় প্রথমে একটি মামলা দায়ের করেন নিহত যুবক সাঈদের চাচা রাশিদুল ইসলাম। মামলার এজাহারে স্পষ্ট বলা হয়, ২ অক্টোবর রাতে একটি সেলুনের ভেতর আবু সাঈদকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ওই মামলার একমাত্র আসামি খলিল নামের এক ব্যক্তি।
কিন্তু এর ঠিক এক মাস পর গাজীপুর আদালতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আখ্যান সাজিয়ে আরেকটি মামলা করেন নিহতের বাবা রফিকুল ইসলাম। আদালতে করা আবেদনে রফিকুল দাবি করেন, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদেরের হুকুমে শ্রীপুর ফ্লাইওভার এলাকায় তার ছেলেকে গুলি ও চাপাতির আঘাতে জখম করা হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় তার ছেলে সাঈদ।
একই ঘটনায় দুই ধরনের বর্ণনা ও দুই মামলার কারণে তদন্তকারীদের মনে সন্দেহের দানা বাঁধে।
নিহত যুবকের বাবার দায়ের করা মামলার আবেদন তদন্তের দায়িত্ব পান পিবিআই-এর উপ-পরিদর্শক শাহ কামাল। তিনি স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হন, আবু সাঈদের সঙ্গে পাশের এলাকার এক বিবাহিত নারীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ছিল। এই পরকীয়ার জের ধরেই তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এর সাথে রাজনৈতিক আন্দোলনের কোনো দূরতম সম্পর্কও ছিল না। শাহ কামাল জানান, ঘটনাটি পুরোপুরি ভিন্ন খাতে নেওয়ার উদ্দেশ্যে এই মিথ্যা ও সাজানো মামলাটি করা হয়েছিল।
সব জানাজানি হওয়ার পর রফিকুল ইসলাম তার মিথ্যাচারের কথা স্বীকার করেন। কেন তিনি ১৬৭ জনের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করলেন-এমন প্রশ্নে তিনি জানান, এক আইনজীবীর পরামর্শে তিনি এটি করেছেন। তবে সেই আইনজীবীর নাম প্রকাশ করতে তিনি অস্বীকৃতি জানান।
রফিকুল ইসলাম স্বীকার করেন, তার ছেলেকে সেলুনের মধ্যেই কুপিয়ে মারা হয়েছে। মামলায় যাদের নাম দিয়েছেন তাদের কাউকেই তিনি চেনেন না। স্থানীয় এক পুলিশ সদস্য তাকে এই মামলা দিয়ে বিচার পাওয়া যাবে না বলে জানানোর পর তিনি সম্প্রতি আদালত থেকে মামলাটি প্রত্যাহার করে নেন।
বাংলাদেশের ফৌজদারি দণ্ডবিধি অনুযায়ী, মিথ্যা অভিযোগ এনে মামলা করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ক্ষেত্রে সাত বছরের কারাদণ্ডসহ জরিমানার বিধান থাকলেও রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এমনকি তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই-ও বাদীর বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করেনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আট শতাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও সেটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে আসামি করার যে প্রবণতা শুরু হয়েছে, আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। সম্প্রতি ডিসি সম্মেলনেও এসব মিথ্যা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে আইনজীবীদের প্ররোচনায় বা রাজনৈতিক ফায়দা নিতে সাধারণ মানুষকে দিয়ে এমন জালিয়াতি করানোর ঘটনা বিচার ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
বিষয় : শেখ হাসিনা মামলা
.png)
রোববার, ১০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ মে ২০২৬
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সারা দেশে শত শত মানুষের মৃত্যুর ঘটনাকে পুঁজি করে ব্যক্তিগত অপরাধকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা বেরিয়ে এসেছে গাজীপুরে।
পরকীয়ার জেরে আবু সাঈদ নামের এক যুবক খুন হওয়ার পর সেটিকে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড দাবি করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৬৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন নিহত যুবকের বাবা। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে ধরা পড়েছে এই জালিয়াতি।
২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর শ্রীপুর থানায় প্রথমে একটি মামলা দায়ের করেন নিহত যুবক সাঈদের চাচা রাশিদুল ইসলাম। মামলার এজাহারে স্পষ্ট বলা হয়, ২ অক্টোবর রাতে একটি সেলুনের ভেতর আবু সাঈদকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ওই মামলার একমাত্র আসামি খলিল নামের এক ব্যক্তি।
কিন্তু এর ঠিক এক মাস পর গাজীপুর আদালতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আখ্যান সাজিয়ে আরেকটি মামলা করেন নিহতের বাবা রফিকুল ইসলাম। আদালতে করা আবেদনে রফিকুল দাবি করেন, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদেরের হুকুমে শ্রীপুর ফ্লাইওভার এলাকায় তার ছেলেকে গুলি ও চাপাতির আঘাতে জখম করা হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় তার ছেলে সাঈদ।
একই ঘটনায় দুই ধরনের বর্ণনা ও দুই মামলার কারণে তদন্তকারীদের মনে সন্দেহের দানা বাঁধে।
নিহত যুবকের বাবার দায়ের করা মামলার আবেদন তদন্তের দায়িত্ব পান পিবিআই-এর উপ-পরিদর্শক শাহ কামাল। তিনি স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হন, আবু সাঈদের সঙ্গে পাশের এলাকার এক বিবাহিত নারীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ছিল। এই পরকীয়ার জের ধরেই তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এর সাথে রাজনৈতিক আন্দোলনের কোনো দূরতম সম্পর্কও ছিল না। শাহ কামাল জানান, ঘটনাটি পুরোপুরি ভিন্ন খাতে নেওয়ার উদ্দেশ্যে এই মিথ্যা ও সাজানো মামলাটি করা হয়েছিল।
সব জানাজানি হওয়ার পর রফিকুল ইসলাম তার মিথ্যাচারের কথা স্বীকার করেন। কেন তিনি ১৬৭ জনের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করলেন-এমন প্রশ্নে তিনি জানান, এক আইনজীবীর পরামর্শে তিনি এটি করেছেন। তবে সেই আইনজীবীর নাম প্রকাশ করতে তিনি অস্বীকৃতি জানান।
রফিকুল ইসলাম স্বীকার করেন, তার ছেলেকে সেলুনের মধ্যেই কুপিয়ে মারা হয়েছে। মামলায় যাদের নাম দিয়েছেন তাদের কাউকেই তিনি চেনেন না। স্থানীয় এক পুলিশ সদস্য তাকে এই মামলা দিয়ে বিচার পাওয়া যাবে না বলে জানানোর পর তিনি সম্প্রতি আদালত থেকে মামলাটি প্রত্যাহার করে নেন।
বাংলাদেশের ফৌজদারি দণ্ডবিধি অনুযায়ী, মিথ্যা অভিযোগ এনে মামলা করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ক্ষেত্রে সাত বছরের কারাদণ্ডসহ জরিমানার বিধান থাকলেও রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এমনকি তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই-ও বাদীর বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করেনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আট শতাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও সেটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে আসামি করার যে প্রবণতা শুরু হয়েছে, আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। সম্প্রতি ডিসি সম্মেলনেও এসব মিথ্যা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে আইনজীবীদের প্ররোচনায় বা রাজনৈতিক ফায়দা নিতে সাধারণ মানুষকে দিয়ে এমন জালিয়াতি করানোর ঘটনা বিচার ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
.png)
আপনার মতামত লিখুন