দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের নারীদের জন্য সরকারের বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্পে যশোরে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
প্রকল্পের সুবিধাভোগীর তালিকায় বহুতল ভবনের মালিক পরিবারের নারীদের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের বাছাই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যশোর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালকসহ তিন কর্মকর্তাকে একযোগে স্ট্যান্ড রিলিজ করেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়।
স্ট্যান্ড রিলিজ হওয়া কর্মকর্তারা হলেন- যশোর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক হারুন অর রশীদ, সহকারী পরিচালক সাইফুল ইসলাম এবং সহকারী পরিচালক ইতি দত্ত সেন। মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখার উপসচিব রবিউল ইসলাম স্বাক্ষরিত পৃথক আদেশে তাদের বদলি করা হয়। আদেশে “জনস্বার্থে” এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে হারুন অর রশীদকে জয়পুরহাটে, সাইফুল ইসলামকে পাবনায় এবং ইতি দত্ত সেনকে গোপালগঞ্জে সংযুক্ত করা হয়েছে।
জানা গেছে, বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অগ্রাধিকারভিত্তিক ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পাইলট প্রকল্পের আওতায় যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে দরিদ্র নারীদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়। প্রকল্পের আওতায় ২ হাজার ৪২ জন নারীকে নির্বাচন করা হয় এবং গত ১৬ মে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়। ওই দিন ভাতুড়িয়া স্কুল মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সারাদেশে দ্বিতীয় পর্যায়ের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
উদ্বোধনের পর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ১ হাজার ৯৮০ জন নারীকে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাঠানো হয়। তবে অভিযোগ ওঠার পর ৬২ জন নারীর অর্থ সহায়তা স্থগিত রাখা হয়।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসব পরিবার ভূমিহীন, স্বামী পরিত্যক্তা, বিধবা, প্রতিবন্ধী সদস্য রয়েছে কিংবা চরম আর্থিক সংকটে রয়েছে এমন নারীপ্রধান পরিবারকে এই প্রকল্পের আওতায় আনার কথা।
কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, তালিকাভুক্ত কয়েকজন নারীর পরিবার এলাকায় প্রভাবশালী ও আর্থিকভাবে স্বচ্ছল। কারও পরিবারের রয়েছে বহুতল ভবন, আবার কেউ ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্য। এমনকি এক পাঁচতলা ভবনের মালিকের স্ত্রীও তালিকায় স্থান পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের ৫৪ জন সমাজকর্মী মাঠপর্যায়ে জরিপ চালিয়ে এই তালিকা প্রস্তুত করেন। তবে অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের নজরে আসে। পরে যাচাই-বাছাই করে ৬২ জনকে “অযোগ্য” হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের ফ্যামিলি কার্ড স্থগিত করা হয়। একই সঙ্গে বাছাই প্রক্রিয়ায় গাফিলতি, তদারকির দুর্বলতা এবং তথ্য যাচাইয়ে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
স্ট্যান্ড রিলিজ হওয়া উপপরিচালক হারুন অর রশীদ বলেন, “মোট ২ হাজার ৪২টি ফ্যামিলি কার্ডের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছিল। ইউনিয়ন সমাজকর্মীরা মাঠপর্যায়ে কাজ করেছেন। পরে ৬২ জন নারীর বিষয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিষয়টি জানতে পেরে আমরাই মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে তাদের কার্ড স্থগিতের সুপারিশ করি। আমি সরাসরি মাঠ জরিপে জড়িত ছিলাম না।”
অন্যদিকে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আশিকুজ্জামান তুহিন বলেন, “ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের পুরো কার্যক্রম জেলা সমাজসেবা কার্যালয় তদারকি করেছে। তালিকাও জেলা অফিস থেকেই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ৬২ জনের কার্ড স্থগিত হওয়ার বিষয়টি আমরা জেনেছি। উপজেলা অফিস এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল না।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ দিয়ে প্রভাবশালী ও স্বচ্ছল পরিবারের সদস্যদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা নতুন নয়। রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে অনেক সময় সরকারি সহায়তার তালিকায় অনিয়ম ঘটে থাকে। ফলে প্রকৃত সুবিধাবঞ্চিত মানুষ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন।
সুশাসন ও সমাজকল্যাণ বিশ্লেষকদের মতে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নেওয়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে সরকারের উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তারা বলছেন, শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলি করলেই হবে না, বরং মাঠপর্যায়ে তথ্য যাচাই, ডিজিটাল ডাটাবেজ ব্যবহার এবং স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে।
.png)
শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুন ২০২৬
দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের নারীদের জন্য সরকারের বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্পে যশোরে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
প্রকল্পের সুবিধাভোগীর তালিকায় বহুতল ভবনের মালিক পরিবারের নারীদের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের বাছাই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যশোর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালকসহ তিন কর্মকর্তাকে একযোগে স্ট্যান্ড রিলিজ করেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়।
স্ট্যান্ড রিলিজ হওয়া কর্মকর্তারা হলেন- যশোর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক হারুন অর রশীদ, সহকারী পরিচালক সাইফুল ইসলাম এবং সহকারী পরিচালক ইতি দত্ত সেন। মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখার উপসচিব রবিউল ইসলাম স্বাক্ষরিত পৃথক আদেশে তাদের বদলি করা হয়। আদেশে “জনস্বার্থে” এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে হারুন অর রশীদকে জয়পুরহাটে, সাইফুল ইসলামকে পাবনায় এবং ইতি দত্ত সেনকে গোপালগঞ্জে সংযুক্ত করা হয়েছে।
জানা গেছে, বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অগ্রাধিকারভিত্তিক ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পাইলট প্রকল্পের আওতায় যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে দরিদ্র নারীদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়। প্রকল্পের আওতায় ২ হাজার ৪২ জন নারীকে নির্বাচন করা হয় এবং গত ১৬ মে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়। ওই দিন ভাতুড়িয়া স্কুল মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সারাদেশে দ্বিতীয় পর্যায়ের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
উদ্বোধনের পর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ১ হাজার ৯৮০ জন নারীকে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাঠানো হয়। তবে অভিযোগ ওঠার পর ৬২ জন নারীর অর্থ সহায়তা স্থগিত রাখা হয়।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসব পরিবার ভূমিহীন, স্বামী পরিত্যক্তা, বিধবা, প্রতিবন্ধী সদস্য রয়েছে কিংবা চরম আর্থিক সংকটে রয়েছে এমন নারীপ্রধান পরিবারকে এই প্রকল্পের আওতায় আনার কথা।
কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, তালিকাভুক্ত কয়েকজন নারীর পরিবার এলাকায় প্রভাবশালী ও আর্থিকভাবে স্বচ্ছল। কারও পরিবারের রয়েছে বহুতল ভবন, আবার কেউ ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্য। এমনকি এক পাঁচতলা ভবনের মালিকের স্ত্রীও তালিকায় স্থান পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের ৫৪ জন সমাজকর্মী মাঠপর্যায়ে জরিপ চালিয়ে এই তালিকা প্রস্তুত করেন। তবে অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের নজরে আসে। পরে যাচাই-বাছাই করে ৬২ জনকে “অযোগ্য” হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের ফ্যামিলি কার্ড স্থগিত করা হয়। একই সঙ্গে বাছাই প্রক্রিয়ায় গাফিলতি, তদারকির দুর্বলতা এবং তথ্য যাচাইয়ে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
স্ট্যান্ড রিলিজ হওয়া উপপরিচালক হারুন অর রশীদ বলেন, “মোট ২ হাজার ৪২টি ফ্যামিলি কার্ডের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছিল। ইউনিয়ন সমাজকর্মীরা মাঠপর্যায়ে কাজ করেছেন। পরে ৬২ জন নারীর বিষয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিষয়টি জানতে পেরে আমরাই মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে তাদের কার্ড স্থগিতের সুপারিশ করি। আমি সরাসরি মাঠ জরিপে জড়িত ছিলাম না।”
অন্যদিকে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আশিকুজ্জামান তুহিন বলেন, “ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের পুরো কার্যক্রম জেলা সমাজসেবা কার্যালয় তদারকি করেছে। তালিকাও জেলা অফিস থেকেই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ৬২ জনের কার্ড স্থগিত হওয়ার বিষয়টি আমরা জেনেছি। উপজেলা অফিস এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল না।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ দিয়ে প্রভাবশালী ও স্বচ্ছল পরিবারের সদস্যদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা নতুন নয়। রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে অনেক সময় সরকারি সহায়তার তালিকায় অনিয়ম ঘটে থাকে। ফলে প্রকৃত সুবিধাবঞ্চিত মানুষ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন।
সুশাসন ও সমাজকল্যাণ বিশ্লেষকদের মতে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নেওয়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে সরকারের উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তারা বলছেন, শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলি করলেই হবে না, বরং মাঠপর্যায়ে তথ্য যাচাই, ডিজিটাল ডাটাবেজ ব্যবহার এবং স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে।
.png)
আপনার মতামত লিখুন