বাসস
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘জুজুর ভয় দেখিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে পিছিয়ে রাখা যাবে না। দেশের মানুষকে দাবিয়ে রাখা যাবে না।’তিনি বলেন, ‘দেশে জনগনের শান্তি নষ্ট করার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। আসুন আমরা নিজেদের সর্তক রাখব, যাতে আর কেউ দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে। জনগণের শান্তি নষ্ট করে ১৭৩ দিন হরতাল পালন করবে, সেই সুযোগ আমরা আর কাউকে দেব না।’সোমবার (২৭ এপ্রিল) বিকালে যশোর জেলার ঈদগাহ প্রাঙ্গণে এক জনসভায় বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। সমাবেশে বিগত আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের আত্মত্যাগ, নিপীড়ন-নির্যাতন, মিথ্যা মামলার পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন তিনি।নির্বাচনে দেওয়া প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে সরকার বাংলাদেশের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপির সকল ক্ষমতার উৎস হচ্ছে বাংলাদেশের জনগণ। সে জন্যই শহীদ জিয়ার রেখে যাওয়া যে কাজ, অসমাপ্ত যে কাজ, সেই কাজ বিএনপি সম্পন্ন করতে চায় দেশের মানুষের স্বার্থে।’জনগণের জন্য শুরু হয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার রেখে যাওয়া যে অসমাপ্ত কাজ, বিগত ২০ বছর ধরে যারা স্বৈরাচারী ছিল, যারা ছিল ক্ষমতায়, তারা সে কাজগুলো জনগণের জন্য করেনি। তাই যে কাজটি বেগম খালেদা জিয়া শুরু করেছিলেন, আবার ২০ বছর পরে তার দল বিএনপি সেই কাজটি জনগণের জন্য শুরু করেছে।’প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ, সে জন্যই আমরা জনগণের জন্য যে কাজ, যে কাজ করলে জনগণ উপকৃত হবে, সেই কাজগুলো বিএনপি করে। সেই ধাবাবাহিকতায় শহীদ প্রসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার জনকল্যাণমুখী অনেক কাজ বিএনপি আবার শুরু করেছে।’তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কোনো টিকেট বিক্রি করতে চাই না। বরং আমরা বাস্তব কাজ করতে চাই। সেজন্য আমরা বলি, করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।এ সময় মঞ্চের সামনে জনগণের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কে কে আছেন আমার সাথে দেশ গড়ার জন্য?’ উত্তরে হাজার হাজার নেতা-কর্মী-সমর্থক হাত তুললে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘হাজারো লক্ষ মানুষ দেশ গড়ার জন্য আছেন, আলহামদুলিল্লাহ। আসুন আজ আমাদের প্রতিশ্রুতি হবে, কবর কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ। কারণ এদেশ আপনার, এদেশ আমার, এদেশ আমাদের সকলের, সকল বাংলাদেশীর।’প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের আস্থা আছে বিএনপির ওপর, তারা বিএনপিকে বিশ্বাস করে। সে জন্যই বাংলাদেশের মানুষ বিএনপিকে ১২ তারিখের নির্বাচনে ম্যান্ডেট দিয়েছে। যে প্রতিশ্রুতি বিএনপি জনগণের কাছে দিয়েছে, সেই প্রতিশ্রুতি যাতে বিএনপি পালন করতে পারে, বাস্তবায়ন করতে পারে, তার ম্যান্ডেট জনগণ বিএনপিকে দিয়েছে।’‘একদল লোকের এই ম্যান্ডেট পছন্দ নয়’ মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এবং সেই জন্যই দেখেছেন বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে তারা বক্তৃতা দিচ্ছে। তারা বলে বেড়াচ্ছে বিএনপি বলে ফ্যাসিবাদের দোসর হয়ে গিয়েছে। আসুন আমরা দেখি, কারা ফ্যাসিবাদের দোসর হয়ে গিয়েছে?’তিনি বলেন, ‘৫ তারিখে পরে বিএনপি পরিষ্কার বলেছে জুলাই-আগস্ট মাসে যারা মানুষ হত্যা করেছে, তাদের বিচার হতে হবে। কিন্তু আমরা দেখেছি ৫ তারিখের পরে কেউ কেউ বলেছিল আমরা সবাইকে মাফ করে দিলাম। বলেছিল না? বলেছিল।’একটি দলকে ইঙ্গিত করে প্রধামমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা কয়েক দিন আগে দেখেছি যারা বক্তৃতার জোরে জোরে কথা বলে, তাদেরই গিয়ে দেখেছি ফ্যাসিবাদের দোসরদের সাথে ঢাকা থেকে অনেক দূরে গিয়ে মিটিং করতে। জনগণ যখন সেটা ঘিরে ফেলেছে, তখন আর তারা কোনো জবাব দিতে পারে না। কেন ফ্যাসিবাদের সঙ্গে গিয়ে মিটিং করেছে?’প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বিএনপির কাছে এখন অগ্রাধিকার হচ্ছে, যে সরকারকে বাংলাদেশের জনগণ ১২ তারিখে নির্বাচনে নির্বাচিত করে, সেই বিএনপি সরকারের কাছে অগ্রাধিকার হচ্ছে মা-বোনদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা, সেই বিএনপির কাছে অগ্রাধিকার হচ্ছে হামের টিকার অভাবে যে বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে, তাদের টিকার ব্যবস্থা করা।’এর বাইরেও বাংলাদেশের গ্রামের, শহরের, উপজেলার মানুষ, জেলার মানুষ যে স্বাস্থ্য সেবা পাচ্ছে না, তাদের স্বাস্থ্যের সেবা নিশ্চিত করার বিষয়ে জোর দেন তিনি।তারেক রহমান বলেন, ‘যেসব বেকার যুবক আছে, তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, আমাদের কাছে অগ্রধিকার হচ্ছে যে কৃষক সঠিকভাবে এখনো কৃষি উপকরণ পাচ্ছে না, তার জন্য কৃষক সহায়তা প্রদানের নিশ্চয়তা করা, আমাদের কাছে অগ্রাধিকার হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের সন্তানদের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া।’প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের মায়েরা-বোনেরা প্রতিদিন একটি কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়, প্রতিদিন একটি যুদ্ধ করে তাদের পরিবারের সকলের আহারের ব্যবস্থা করতে হয়। এই রান্নার ব্যবস্থা করার সময় যে চুলা জ্বালাতে হয়, তার জন্য গ্যাস বা খড়ি যেটাই ব্যবহার করুক এটি একটি সমস্যার কারণ।’‘আমরা গত দুদিন আগে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি, ইনশাল্লাহ মায়েদের হাতে আমরা যেমন ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিয়েছি, ঠিক একইভাবে সারা দেশের যাদের ফ্যামিলি কার্ড দেব, ঠিক সেই মায়েদের কাছে আমরা আরেকটি কার্ড দিব, সেই কার্ডটি হচ্ছে ‘এলপিজি কার্ড’। যাতে তাদের আর রান্নার কষ্ট পোহাতে না হয়। যাতে পরিবারের খাবার-দাবার, রান্না-বান্না করার সময় দুশ্চিন্তায় পড়তে না হয়। ধীরে ধীরে ইনশাল্লাহ আমরা সেই ব্যবস্থাও মায়েদের জন্য করব’ বলেন তিনি।জুলাই সনদ বাস্তবয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি পরিষ্কারভাবে তুলে দিতে চাই বিএনপিসহ সকল রাজনৈতিক দল মিলে আমরা সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদ সই করেছি। বাংলাদেশের মানুষ ভোটের মাধ্যমে রায় দিয়েছে যে, যেই জুলাই সনদ জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সই করা হয়েছে, সেই জুলাই সনদ পাস করতে হবে। সেই জুলাই সনদের প্রতিটি শর্ত, প্রতিটি লাইন ইনশাল্লাহ বিএনপি সংসদে পাস করবে।’সবাইকে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসুন, আমাদের আজ সতর্ক হতে হবে সেসব লোকের বিরুদ্ধে, যারা বিভ্রান্তি ছড়াতে চায়।’বিশেষ একটি দলের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় মানুষকে বিভ্রান্তির চেষ্টা করেছিল, যারা ’৮৬ সালে বিভ্রান্তি করেছিল, যারা ’৭১ সালে বিভ্রান্তি তৈরি করেছিল, যারা ২০০৯ সালে বিভ্রান্তি করেছিল, ঠিক এসব ব্যক্তি আজ আবার ২০২৬ সালে বিভ্রান্তির চেষ্টা করছে। কাজেই আমাদের আজ দেশ গড়তে হবে। আমাদের দেশকে সামনে নিয়ে যেতে হবে, আমাদের দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে হবে।’এ সময় দেশের ২০ কোটি মানুষের হাতকে ৪০ কোটি হাতে রূপান্তর করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।যশোর জেলা বিএনপির উদ্যোগে এই জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ সাবেরুল হক সাবুর সভাপতিত্বে জনসভায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপিকা নার্গিস বেগম, যুগ্ম মহাসচিব পানি সম্পদমন্ত্রী শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।