প্রিন্ট এর তারিখ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬
বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তায় সাবেক সরকারের ক্যাডাররা!
নূর ইসলাম ||
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার, বর্তমান মন্ত্রিসভার সদস্যসহ ভিআইপিদের নিরাপত্তায় দেহরক্ষী (বডিগার্ড) হিসেবে নিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই দেহরক্ষীদের বেশির ভাগ ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক সুপারিশে নিয়োগপ্রাপ্ত। তাঁরা তৎকালীন মন্ত্রীদের এবং পরবর্তী সময়ে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের অনেকের দেহরক্ষী ছিলেন।অভিযোগ ওঠার পর এরই মধ্যে ভিআইপিদের নিরাপত্তায় নিযুক্ত অন্তত ১২ জনকে দেহরক্ষীর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আরও অন্তত ৩০ জনের বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে।স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলেছে, নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার শপথের আগে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল, বিগত সরকারের সময়ে দেহরক্ষী থাকা কাউকে রাখা হবে না। কিন্তু পরে তদবির, সুপারিশ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে উৎকোচের কারণে বিগত সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেককে নিযুক্ত করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের কারও কারও বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে এবং রাজনৈতিক সুপারিশে আওয়ামী লীগ আমলে পুলিশে নিয়োগ পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধান সরদার নুরুল আমিন গত বৃহস্পতিবার বলেন, দেহরক্ষী নিয়োগ নিয়ে বেশ কিছু অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল। এরপর কয়েকজনকে পরিবর্তন করা হয়েছে। অন্যদের বিষয়েও নিখুঁতভাবে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন হলে বাকিদেরও পরিবর্তন করা হবে।স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, চিফ হুইপ, হুইপ এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসবি থেকে এ পর্যন্ত ১১১ জন পুলিশ সদস্যকে গানম্যান/দেহরক্ষী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে তাঁদের একটি বড় অংশই পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া এবং ওই সরকারের মন্ত্রীদের নিরাপত্তায়ও ছিলেন।সূত্রগুলো বলছে, পুলিশের প্রতিবেদনেই উঠে এসেছে অভিযোগ ওঠা দেহরক্ষীদের অনেকে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে ‘ছাত্রলীগ কোটায়’ অথবা আওয়ামী লীগের নেতাদের আত্মীয়স্বজন এবং সাবেক এমপিদের সুপারিশে নিয়োগ পেয়েছিলেন। ফলে বর্তমান বিএনপির সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তার দায়িত্বে তাঁদের নিযুক্ত করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, নতুন সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা শপথ নেওয়ার আগেই এসবি থেকে তাঁদের জন্য দেহরক্ষী বাছাই করা হয়েছিল। তখন ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাউকে এমন দায়িত্বে না রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল। তবে পরে তা ভেঙে বিতর্কিত অনেককে দেহরক্ষী নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই নিয়োগে এসবির সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তার তদবির ছিল। কোনো কোনো তদবিরের পেছনে উৎকোচের ঘটনাও ছিল। পুলিশ সদরেরও কেউ কেউ কারও কারও ব্যাপারে সুপারিশ ছিল।সূত্র বলেছে, নিযুক্ত করার কিছুদিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ভিআইপিদের সঙ্গে বেশ কয়েকজন দেহরক্ষীর স্বাভাবিক আলাপচারিতায় তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ পায়। পরে বিষয়টি পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) অবহিত করা হলে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (কনফিডেনশিয়াল) কামরুল আহসানের সই করা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, এ ধরনের নিয়োগ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর তথ্যের গোপনীয়তা বিনষ্টের ঝুঁকি তৈরি করছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভিআইপিদের গানম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারীদের পুনরায় নিয়োগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত থাকলেও বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের সুপারিশে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বেশ কয়েকজনকে নিয়োগ দিতে হয়েছে। পাশাপাশি আরও কয়েকজনের রাজনৈতিক পরিচয় শনাক্ত হয়েছে, যাঁদের দ্রুত প্রত্যাহারের সুপারিশ করা প্রয়োজন।দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, বিষয়টি নিয়ে অবহেলার কোনো সুযোগ ছিল না। দেশের পুলিশ বাহিনী এখনো এতটা পেশাদার হয়ে ওঠেনি যে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক মতাদর্শ পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে।বিগত আওয়ামী লীগ আমলের যাঁরা এই আমলেও দেহরক্ষী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, পুলিশ সদর দপ্তরের দেওয়া তালিকায় নাম থাকা কনস্টেবল কাউছার আহমেদ পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটুর দেহরক্ষী ছিলেন। পরে তিনি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের দেহরক্ষী ছিলেন। তিনিই পরে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের গানম্যান নিয়োগ পেয়েছেন।তালিকায় নাম থাকা কনস্টেবল মো. তাসনীম আলম সাবেক শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদারের এবং পরে অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানের দেহরক্ষী ছিলেন। বর্তমান সরকারের সময়েও তাঁকে আবার একই দায়িত্বে রাখা হয়।কনস্টেবল মো. জাকির হোসেন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমানের গানম্যান ছিলেন। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর নিরাপত্তায় যুক্ত হন। পরে তাঁকে বর্তমান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টুর গানম্যান করা হয়।এএসআই বশির উল্লাহ ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. শহীদুজ্জামান সরকারের গানম্যান ছিলেন। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের নিরাপত্তায় যুক্ত হন। বর্তমান ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনুর দেহরক্ষী হিসেবে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়।কনস্টেবল আশিকুল ইসলাম ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল আবু মোহাম্মদ আমিন উদ্দিনের দেহরক্ষী ছিলেন। তাঁকে বর্তমান আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের দেহরক্ষী নিযুক্ত করা হয়।এএসআই আব্দুর রহমান ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের দেহরক্ষী ছিলেন। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমানের দেহরক্ষী ছিলেন। নতুন সরকার আসার পর তাঁকে নৌপরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসানের নিরাপত্তায় নিয়োজিত করা হয়।কনস্টেবল রাসেদুল হক সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর দেহরক্ষী ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকীর নিরাপত্তায়ও ছিলেন। বর্তমান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের দেহরক্ষীও নিযুক্ত হন তিনি।সাবেক প্রতিমন্ত্রী এনামুল হক শামীমের দেহরক্ষীর দায়িত্ব পালন করা কনস্টেবল মিলন মাতব্বরকে নিয়োগ করা হয় বর্তমান সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীনের নিরাপত্তায়।সাবেক প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঁঙ্গা, কে এম খালিদ মাহমুদ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের দেহরক্ষী ছিলেন এএসআই কামরুজ্জামান। বর্তমান সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীর দেহরক্ষীও করা হয় তাঁকে।এসবিতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদন পাওয়ার পর অন্তত ১২ জন ভিআইপির দেহরক্ষীকে পরিবর্তন করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী; সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী; তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী; স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ; ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিনের দেহরক্ষী রয়েছেন।এসবির অতিরিক্ত আইজিপি সরদার নুরুল আমিন বলেন, গানম্যান বা দেহরক্ষী নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়মিত ভেটিং করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী অনেককে পরিবর্তন করা হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।সার্বিক বিষয়ে সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ যদি নিরপেক্ষ ও পেশাদার হয়, তাহলে এ ধরনের সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু নিয়োগ দলীয় বিবেচনায় হয়ে থাকলে নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজাম্মুল হোসেন
বার্তা সম্পাদক: হুমায়ুন কবির সবুজ
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত সার্চটুডে